ভালোবাসার বার্তা ১৪ই ফেব্রুয়ারী 



আসছে ১৪ই ফেব্রুয়ারী লক্ষ্য তরুণ-তরুণীর বহুল প্রত্যাশিত বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। ভালোবাসার সবুজ ছায়াতলে আমিও সবাইকে জানাই সাধর সম্ভাসন। ভালোবাসা হল সার্বজনীন(universal)। পৃথিবী টিকে থাকার সব চালিকা শক্তির মধ্যে ভালোবাসা অন্যতম একটি শক্তি।  


পৃথিবীর প্রতিটি সৃষ্টির মধ্যেই ভালোবাসা রয়েছে। আপনি যদি কোন একটা কুকরকে দুই দিন নিয়মিত খাবার দেন সে আপনাকে ভালোবেসে ফেলবে। আর এ ভালোবাসার জন্য সে আপনার কল্যানকামীও হয়ে উঠবে।


মানুষ হল সৃষ্টির সেরা। অন্য সব সৃষ্টি অপেক্ষা তাদের ভালোবাসার শক্তি অনেক গুণ বেশি। কারণ আল্লাহ সুবহানা তাআলা তাদেরকে ভালোবাসার অসীম শক্তি দিয়েছেন যেটা অন্য জীবদের মধ্যে রয়েছে সিমীত। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে  যাবে।ধরেণ একটা বাঘ, যখন খিদে পায় তখন তার একটাই লক্ষ্য থাকে, তাকে খেতে হবে। এ সময় মায়াবী হরিণ সে যতই চমৎকার হোক না কেন তার প্রতি  বাঘের কোন ভালোবাসাই কাজ করবে না। কিন্তু মানুষ তো এরকম  নয়। প্রসংগত একটি ঘটনা উল্লেখ করছি “কোন এক যুদ্ধের ময়দানে,আহত এক সৈনিক সামান্য একটু পানি মুখে নিতে যাবে,হয়তো সে পানিটুকু পান করতে পারলে  তার জীবন রক্ষা পেতে পারে। ঠিক এ সময়েই পাশে থাকা অপর সৈনিকের ‘পানি পানি’ আর্তনাদ তার কানে এল। তৎক্ষণাৎ সে নিজে পানি পান না করে পাশের সৈনিককে দিয়ে দিল। সে সৈনিকটি যখন পানি মুখে দিতে যাবে ঠিক তখনই পাশ থেকে এল অপর  সৈনিকের ‘পানি,পানি’ আওয়াজ এভাবে সে পানিটুকু চলে এল ৩য় সৈনিকের কাছে। কিন্তু তিনিও সেটি পান করতে পারলেন না,দিয়ে দিলেন পাশের সৈনিকেকে।  এভাবে সে যুদ্ধক্ষেত্রে যতজন আহত সৈনিক ছিলেন কারো উদরেই সে পানি প্রবেশ না করে সেটি ঘুরে যখন প্রথম সৈনিকের কাছে চলে আসল তখন তিনি ইহলোক ত্যাগ করলেন। ঠিক একইভাবেই ওই সময়ে ময়দানে থাকা সব সৈনিকই  ইহলোক ত্যাগ  করলেন। কারোই আর পানি পান করা হল না।” এ হল ভালোবাসার  নমুনা। একমাত্র ভালোবাসার কারণে তাদের প্রত্যেকের কাছেই নিজের জীবনের চেয়ে অন্য সৈনিকের কষ্ট লাঘব করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল

এতদূর কল্পনা না করলেও চলবে। আমাদের বাংলাদেশের ইতিহাসের দিকেই দেখুন না। অন্যায় অবিচার থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য এদেশের সূর্য সন্তানেরা কোন রকম কুন্ঠাবোধ ছাড়াই অকাতরে নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন। এর পিছনে একটাই কারণ ছিল,তা হল স্বদেশের প্রতি ভালোবাসা। আমরা হলাম সেই জাতি যারা নিজের ভাষা,সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা থেকে জীবন দিয়েছিলাম। আবার  কেউ কেউ ছাত্রত্ত  হারিয়ে অনিশ্চিত জীবনে পা রেখেছিল। ভাষা আন্দোলনের সেদিনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে যারা বহিষ্কার  হয়েছিলেন তাদের কেউই আর ফিরে যেতে পারেন নি নিজের ক্যারিয়ারের স্বপ্ন পূরণে। এভাবেই সংস্কৃতিকে ভালোবেসেছিল আমাদের ভাষা সৈনিকেরা। 

আজ আমরা একবিংশ শতাব্দীর মানব জাতি ।আমাদের কাছে ভালোবাসার আবেদনটা আজ কতটুকু? মানুষ হিসেবে আমরা ভালোবাসার কতটুকু বহিঃপ্রকাশ করতে পেরেছি? আপনারা কে কী ভাবেন আমি জানি না, আমার কাছে ১৪ই ফেব্রুয়ারী, বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের তাতপর্য হল মানুষ হিসেবে আমাদের বিশ্বপ্রেমটা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার দিন। কিন্তু আসলে বাস্তবতায় বিশ্বপ্রেমের আহ্বান কতটুকু ফুটে উঠছে।  

ফেব্রুয়ারী মাসে শুরু হওয়ার সাথে সাথে ফেইসবুক,ইউটিউবসহ সব ধরণের সোসাইল মিডিয়াতে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস নিয়ে ব্যাপক প্রস্তুতি দেখা গিয়েছে। বের হয়েছে বিভিন্ন নাটক,সংগীত,শর্ট ফিল্ম, ভোকাল ভিডিও, বিজ্ঞাপন ইত্যাদি। কিন্তু সেসবের কোথাও দেখি নি বিশ্বপ্রেমের আহ্বান । সেগুলোতে দেখেছি শুধু নারী-পুরুষের অবাধ এবং অনৈতিক সম্পর্কের সয়লাব।


আচ্ছা বিশ্ব ভালোবাসা দিবস কাদের জন্য? এ দিবসটি কী আসলে ভালোবাসার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য? যদি ভালোবাসা ছড়িয়ে দেওয়ার বার্তাই বহন করে এ দিবসটি তাহলে কেন আমরা আজ ব্যাথিত হচ্ছি না মায়ানমার কিংবা সিরিয়ার শিশুদের  জন্য? কেন আমরা ব্যাকুল হচ্ছি না গৃহহারা মানুষের জন্য? কেন আমাদের হৃদয় কেঁদে উঠছে না আমাদের দেশের সমস্যাগুলোর জন্য?

আপনি যদি ডিকশেনারিতে ‘Valentine Day’ লিখে সার্চ করেন তাহলে এর অর্থ দেখাবে ‘A day for the exchange of affection.’ অর্থাৎ ভালোবাসার আদান-প্রদান যা এ দিবসের মূল উদ্দ্যেশ্য। কিন্তু বাস্তবে কী হচ্ছে? বাস্তবে এ দিনটি হল অবৈধ অনৈতিক যৌনাচার  চর্চার দিন। এ দিবসে বিভিন্ন মিডিয়াতে যতসব প্রোগ্রাম আয়োজন হয় তার সবগুলোতেই তরুণ-তরুণীর অনৈতিক প্রেমকেই তুলে ধরা হয়। আরো দেখানো হয়,প্রিয় পরিবার,নিজের ঘর ছেড়ে অজানা কারো হাত ধরে বের হয়ে যাওয়ার দৃশ্য। ভালোবাসার মানে কী দুই জন তরুণ-তরুণীর অবাদ মেলামেশা? ভালোবাসার মানে কী ঘর ছেড়ে অন্য  কারো হাত ধরে পালিয়ে যাওয়া? ভালোবাসার মানে কী নিজের সকল আপনজন,জম্নদাতা মা-বাবাকে নিজের জীবন থেকে প্রত্যাহার করা? 

সৃষ্টিকর্তা নারী-পুরুষের বৈধ সম্পর্ককে পৃথিবীর অন্যতম একটি সুন্দর নিদর্শন হিসেবে দিয়েছেন। কিন্তু আবাধ অনৈতিকতা,যৌনাচারকে দিয়েছে ধিক্কার। পৃথিবীর কোন ধর্মই বিবাহ বহির্ভুত অনৈতিক সম্পর্ককে সমর্থন করে না। রাসূল (সাঃ) হাদীসে বলেছেন ‘অনৈতিকভাবে বিপরীত লিংগের কারো দিকে তাকানো চোখের জিনা,কান দিয়ে অনৈতিক কিছু শোনা কানের জ্বিনা, মুখ দিয়ে অনৈতিক কিছু বলা মুখের জ্বিনা, অনৈতিক কোন উদ্দ্যশ্যে পা দিয়ে হেটে যাওয়া পায়ের জ্বিনা, একইভাবে হাত দিয়ে স্পর্শ করা হাতের জ্বিনা এমনকি হৃদয় দিয়ে কল্পনা করা অন্তরের জ্বিনা।’ আর জ্বিনাকারীর শাস্তি দুনিয়া এবং আখিরাত দুই জাহানেই অত্যন্ত কঠিন।

অনৈতিক সম্পর্ক আমাদের পারিবারিক এবং সামাজিক সম্প্রিতি বিনষ্ট করছে। আর অবৈধ এসব যৌনাচারের ফলাফল স্বরুপ তৈরি হচ্ছে এইডস,সিফিলিস,গনোরিয়ার মত মারাত্মক সব ব্যাধি। অথচ আজ ইউটিউবে অসংখ্য কন্টেন্ট এর মূল মোটিভ হল নারী-পুরুষের অবৈধ যৌনাচার। এমনকি ফেইসবুকে অনেক অনেক গল্পের গ্রুপ রয়েছে যেগুলোতে বিভিন্ন আংগিকে অবৈধ যৌনাচারের দিকে আহ্বান জানানো হচ্ছে। 

আজকাল বিয়েকে করা হচ্ছে কঠিন এবং ব্যাবিচার এর দরজা সহজ করে উম্নুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে। আমাদের দেশে বর্তমানে একজন ছেলে বা মেয়ের পড়াশোনা শেষ করতে প্রায় ২৬/২৭/২৮ বছর লেগে যায়। তারপর চাকুরীর বাজারে স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন যাপনের জন্য উন্নত স্যালারির চাকুরীর পেতে লেগে যায় আরো কয়েক বছর।  এর সাথে আছে অতিরিক্ত ঝাক-ঝমক করে বিয়ে করতে চাওয়ার ইচ্ছা এবং অসাধ্য পরিমাণ মোহরানার চাহিদা। আরো বড় সমস্যা হচ্ছে,ছাত্র থাকাকালীন তারা অবৈধ প্রেম নিয়ে মজে থাকায় নিজেকে ক্যারিয়ারের জন্য যোগ্য করে তুলতে পারে না। ফলে ভালোবাসা নাম দিয়ে নিজেদের কামনা-বাসনার দ্বিতীয় পন্থা বঁচে নেয় এসব তরুণ-তরুণী। আর ঘটা করে সবাইকে সে দিকে আহ্বান করার জন্য পালিত হয় ভালোবাসা দিবস নামক বেহায়া দিবস। 
কথিত এসব ভালোবাসা দিবস আমাদের সমাজে গুণ ধরাতে শুরু করেছে। শুরু হয়ে গেছে পারিবারিক বন্ধনের ভাংগণ। চলে যাচ্ছে দাম্পত্য জীবনের বিশ্বাস-আস্থা ।এসব বেহায়াপণা এখনই দূর না করলে এভাবে অচিরেই সমাজে ভাংগণ দেখা দিবে।

তাই সবশেষে কয়েকটি কথা বলব, আমাদের সমাজকে বাঁচানোর দায়িত্ব আমাদের। সমাজে বিবাহ প্রথা সহজ করা হোক, আর ব্যাবিচারের পথ বন্ধ করা হোক। আমাদের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে অবৈধ যৌনাচার প্রত্যাহার করে ধৈর্য্য ধরার মানুষিকতা গড়ে উঠুক। সর্বোপরি কথিত বিশ্ব ভালোবাসা দিবস নামক বেহায়া দিবস প্রত্যাহারে সবাই সোচ্ছার হয়ে উঠুন। 

Written by: Nusrat Hurain