একুশের চেতনা
কয়েকদিন আগে আমার বিবিএ পরীক্ষা ছিল। দীর্ঘ পাঁচ মাস অসুস্থ অবস্থায় বিচানায় কাটানোর পর হঠাৎ করেই বিবিএ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম। যেহেতু ক্লাস করি নি, কোন বই কাছে ছিল না, আর সময় এত কম ছিল যে ইংরেজী পড়েও বুঝতে সময় লাগবে বেশি। তাই চিন্তা করলাম দেখি গুগলে বাংলা কিছু পাওয়া যায় কিনা, বাংলায় পেলে তাড়াতাড়ি বিষয়গুলো বুঝতে পারব। গুগলে একাউন্টিং এর বেশ কয়েকটি বিষয় নিয়ে বাংলাতে সার্চ করেছিলাম। কিন্তু প্রতিটি সার্চের রেজাল্ট হিসেবে পেয়েছি শুধুমাত্র স্নাতক কোন এক পরীক্ষার অনেক পুরনো একটি সাজেশান।
এটি একটি উদাহরণ মাত্র। আমি ইলেকট্রনিক এন্ড টেলিকমিউনিকেশান ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী। আমার সাবজেক্টের কোন কন্টেন্টই গুগলে বাংলাতে নেই। ইউটিউব খুঁজে ইলেকট্রনিক্স এর একটাও স্নাতক লেভেলের বাংলা ভিডিও পাবেন না।
এবার আসি প্রোগ্রামিং নিয়ে। এ নিয়ে কিছু কন্টেন্ট গুগোলে বাংলায় পাওয়া যাচ্ছে। ইউটিউবেও বেশ কিছু চ্যানেল আছে। কিন্তু ব্লগের আর্টিকেলসমূহ খুবই দূরহ ভাষায় লিখা যেটা পড়ে বোঝা ইংরেজীর মতই কঠিন। এক কথায় প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
কয়েক দিন ধরে মোবাইলে ইন্টারনেট কানেকশান অন করলেই স্ক্রিনে যে নোটিফিকেশকানগুলো ভেসে আসে তারমধ্যে সবচেয়ে বেশি আসে ইউটিউব থেকে ‘ধর্ষণ করে বিয়ে, ধর্ষক যখন বর, আগে প্রেগনেন্ট কর তারপর বিয়ে’ এ ধরনের শিরোনামের ভিডিও। আপনি শিক্ষামূলক বিষয় সার্চ করেন আর ধর্মীয় বিষয় সার্চ করেন না কেন নিচ দিয়ে অশ্লীল বাংলা ভিডিও এর লিংক দেখতে পাবেনই। কিন্তু অশ্লীল একটা ভিডিও সার্চ দেন দেখবেন সাজেশানে ভালো বিষয়ের ভিডিও লিংক পাবেন না।
এর কারণ কী? কারণ ইউটিউবে বাংলা ভাষায় ভালো কন্টেন্ট এর পরিমান খুবই কম। তাই ঘুরে ফিরে বার বার ঐ খারাপ জিনিসগুলোই আসতে থাকে। আমাদের তরুণ প্রজন্ম হয়তো পড়াশোনার উদ্দ্যেশ্যে ইন্টারনেট ব্রাউজ করে আর নেশাগ্রস্তের মত সেসব দেখতে থাকে এবং সেখান থেকে ফিরে আসে অশিক্ষা-কুশিক্ষা নিয়ে।
যারা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছেন তাদের কাছ থেকে আজ আমাদের ইন্টারভিউ নেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু যারা সেদিন ভাষা আন্দোলনের কারণে ছাত্রত্ত হারিয়েছিলেন,নিজ হাতে ডেকে এনেছিলেন অনিশ্চিত জীবনের হাতছানি তাদের মধ্যে যারা আজও বেঁচে আছেন তাদের একটা ইন্টারভিউ নিয়ে দেখতে পারেন তারা কী বলে। তারা কী মাতৃভাষায় নোংরামি চর্চার জন্য ভাষা আন্দোলন করেছিলেন?
সৃষ্টিকর্তা মানুষকে নিয়ামত স্বরূপ যে ভাষা দান করেছেন তার যথাযথ ব্যবহারের জন্য সবাই দায়বদ্ধ। কিন্ত আমরা যারা বাংজ্ঞালী আমাদের এ দায়বদ্ধতা একটু বেশিই। কারণ স্রষ্টা ভাষা দান করার পরও এ ভাষার জন্য আমাদের অনেক ভাই রক্ত ঢেলে জীবন দিয়েছিলেন, অনেক ভাই মানবেতর জীবন ডেকে এনেছিলেন। আমরা ভাষার অপব্যবহার করলে তাদের আত্মা কষ্ট পায়,তাদের অবমাননা করা হয় এবং নিশ্চয় তারা কবর জমিন থেকে আমাদের অভিশাপও দেয় বলে আমি মনে করি।
ভাষা এবং ভাষা শহীদদের মর্যাদা শুধুমাত্র ২১শে ফেব্রুয়ারীতে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে,উচ্চস্বরে গান বাজিয়ে কিংবা সভা সেমিনার করে প্রদর্শণ করা সম্ভব নয়। ভাষা এবং ভাষা শহীদদের মর্যাদা কেবল তখনই পরিপূর্ণ হবে যখন এ ভাষা দিয়ে অর্জিত জ্ঞানের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্ব দুয়ারে মাথা উঁচু করে দাড়াতে পারবে, যখন এ ভাষাকে ব্যবহার করে শুধুমাত্র সুন্দরের চর্চা হবে, কোন অসৎ এবং অশ্লীলতার চর্চা হবে না, যখন এ ভাষা হবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রধান অস্র, যখন এ ভাষা ভালোবাসা প্রকাশের বাহন এবং সহানুভূতি প্রকাশের মাধ্যম হবে।
এশিয়া মহাদেশের উন্নত দেশ চীন,জাপান,কোরিয়া এরা আজ বিশ্ব দুয়ারে এতদূর এগিয়ে গেছে শুধু তাদের ভাষার সমৃদ্ধির জন্য। নিজ ভাষা আত্মা সংলগ্ন বিষয়। মাতৃভাষার মত করে উপলব্ধি,অনুভব অন্য কোন ভাষা দিয়ে সম্ভব নয়। আজ বড় বড় আবিষ্কারগুলো দেখেন এগুলোর বেশিরভাগই করছে ইংরেজী ভাষাভাষী মানুষ অথবা হিব্রু,গ্রিক,জাপানিজ এবং চায়নিজভাষী জাতিসমূহ। এর প্রধান কারণ হল তারা মাতৃভাষায় জ্ঞান চর্চা করার সুযোগ পাচ্ছে যেটা আমরা বাংগালীরা পাচ্ছি না।
তাই আজ অমর একুশের এই লগ্নে আমার একটাই চাওয়া আমার মায়ের ভাষা,অন্তরের ভাষা আমার বাংলা ভাষা হয়ে উঠুক জ্ঞানের ভাষা,সত্যের ভাষা,ন্যায়ের ভাষা,সফলতার ভাষা।
লেখকঃ নুসরাত হুরাইন
0 Comments